বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র: কুফল, প্রভাব ও করণীয়
রাজনৈতিক দলে পরিবারতন্ত্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একটি রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ নেতা বা দলটি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যদের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনটি পরিবার দেশের বৃহৎ ৩টি দল নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই পরিবারগুলোর বাইরে কেউ কখনো দলের প্রধান হতে পারে না এবং দলে কাকে কোন পদবি দেয়া হবে তাও নির্ধারণ করে এই পরিবারগুলো। শুধুতাই নয় দলগুলো সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও নিয়োগ করা হয় এই পরিবারগুলোর ইচ্ছার ভিত্তিতে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৮০ ভাগ জনগণ এই তিন পরিবারের হাতে জিম্মি। পরিবারগুলো হলো ;-
এই পরিবারগুলো দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে আছে। এই দলগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দলীয় প্রধান হতে হলে যোগ্যতা, জনসমর্থন, সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না, পারিবারিক পরিচয়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে।
নিচে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির নেতা নির্বাচন পদ্ধতি ও সমাজে এর কুফলগুলো আলোচনা করা হলো-
১. নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতার চেয়ে বংশপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে
পরিবারতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কুফল হলো—রাজনীতিতে নেতৃত্বের সুযোগ সবার জন্য সমান থাকে না। একজন যোগ্য, দক্ষ ও জনপ্রিয় ব্যক্তি শুধু রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য না হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়তে পারেন। এতে মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
২. রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়
একটি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ যদি বারবার একই পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে দলের অভ্যন্তরে মতামত প্রকাশ, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। ধীরে ধীরে দলটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ হাসিনা ও তার পরিবার কেন্দ্রিক, বিএনপির রাজনীতি তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্য কেন্দ্রিক, জাতীয় পার্টির রাজনীতি এরশাদের পরিবার কেন্দ্রিক।
৩. তোষামোদ ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি বাড়ে
পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চারপাশে অনেক সময় এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে নীতিগত সমালোচনার পরিবর্তে নেতাকে খুশি করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যের মূল্য বাড়ে এবং দলের ভেতরে গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়। যেমন ২০২৬-এর নির্বাচনের পর আমরা দেখতে পাই শুধুমাত্র মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য ঢাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর, আন্দালিব রহমান পার্থ, ক্রীতদাসের মতো জিয়া পরিবারের গুণগান ও তারেক রহমানকে বিভিন্নভাবে তোষামোদ করে তারা মন্ত্রী হয়েছিল। এমনকি দলের ত্যাগী নেতারা ভালো কোনো দায়িত্ব না পেয়ে দলের বাইরে থেকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পেয়েছে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাটুকারিতা ও গুণকীর্তন গাওয়ার জন্য। উদাহরণ হিসেবে আমরা নাগরিক পার্টির রাশেদ খানকে ধরতে পারি। তিনি শুধুমাত্র তারেক রহমানের তোষামোদীতে পারদর্শী হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার পদ পেয়ে ছিলেন।
৪. রাষ্ট্র ও দলের মধ্যে পার্থক্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে
পরিবার ও দল যখন দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, তখন দলীয় স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি, হিসাব-নিয়ামক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যের মতো বড় বড় পদগুলো যুগ যুগ ধরে দলীয় প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির উপর টিকে থাকে। এখানে বড় যোগ্যতা রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্টি।
৫. নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়
একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু পরিবারতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হলে তরুণ রাজনীতিবিদদের সামনে উঠে আসার সুযোগ কমে যেতে পারে। ফলে দলগুলোতে নেতৃত্বের নবায়ন ও প্রজন্মান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। যেমন বিএনপিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভীর মতো নেতারা রাজনীতিতে সমস্ত জীবন শেষ করে দিলেও দলীয় প্রধান হতে পারবে না। বিএনপির প্রধান হতে হলে তাকে অবশ্যই জিয়া পরিবারের সদস্য হতে হবে। একইভাবে আওয়ামী লীগের মো. ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনরা কখনো দলীয় প্রধান হতে বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না। তবে এখানে ভিন্ন একটি ধারা লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশে এই পরিবারগুলোর বাইরে রাষ্ট্রপতি হতে দেখা যায়। কারণ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা সীমিত। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অসীম।
৬. রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হতে পারে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের কারণে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় নীতির পরিবর্তে ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে প্রতিযোগিতার রূপ নেয়। এতে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল এবং বিভাজন তীব্র হতে পারে।
৭. দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঝুঁকি বাড়ে
পরিবারতন্ত্র সরাসরি দুর্নীতির কারণ—এমন কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু ক্ষমতা যখন দীর্ঘদিন একই পরিবার বা ঘনিষ্ঠ বলয়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন স্বজনপ্রীতি, পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারকে দেশ থেকে তাড়াতে বাধ্য হয়। বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছে।
৮. জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত হতে পারে
গণতন্ত্রের মূল কথা হলো—সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও নেতৃত্ব তৈরি হবে। কিন্তু যদি জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে শীর্ষনেতৃত্বে যেতে হলে কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তাহলে রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা ও ভোট কারচুপির কারণে জনগণ ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
রাজনৈতিক পরিবার থাকা এবং পরিবারতন্ত্র এক বিষয় নয়।
কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান বা সদস্য যদি নিজের যোগ্যতা, রাজনৈতিক কর্মদক্ষতা ও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্বে আসেন, সেটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। সমস্যা হলো যখন পারিবারিক পরিচয় উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দলের ভেতরের গণতন্ত্র, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশে করণীয়
পরিবারতন্ত্রের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে প্রয়োজন—
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রকে শুধু কয়েকটি পরিবারের উপস্থিতির প্রশ্ন হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরে যাওয়া হবে না। মূল প্রশ্ন হলো—রাজনীতি কি ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর নির্ভর করবে, নাকি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নীতি ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর দাঁড়াবে?
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে আসার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি একজন সাধারণ নাগরিকেরও যোগ্যতা ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যাওয়ার সমান সুযোগ থাকতে হবে। বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্রের জন্য তাই পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, যোগ্যতাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: আরিফুল ইসলাম
সহকারী পরিচালক
ইকরা মডেল
একাডেমি

Comments
Post a Comment