বাংলাদেশে OSD: প্রশাসনিক ব্যবস্থা নাকি রাজনৈতিক হাতিয়ার? ভারত, চীন ও জাপানের তুলনায় আলোচনা
ওএসডি
(Officer on Special Duty) মূলত
একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগে গভীর
রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব
রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি জরুরি বা বিশেষ প্রয়োজনে
পদায়নের একটি কাঠামো, কিন্তু বাস্তবে এটি প্রায়শই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, আমলাতান্ত্রিক কোন্দল এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই
ব্যবস্থার রাজনৈতিক দিক, বাংলাদেশে এর আধিক্য, আন্তর্জাতিক
তুলনা এবং চীন-জাপানের প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ওএসডি
কি
একটি
রাজনৈতিক
পদায়ন?
আইনগত
বা তাত্ত্বিকভাবে ওএসডি কোনো রাজনৈতিক পদায়ন নয়, এটি একটি শুদ্ধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর ব্যবহার দ্বিমুখী:
নেতিবাচক/রাজনৈতিক
ব্যবহার
(বাস্তব
চিত্র):
বাংলাদেশে
সরকার পরিবর্তন হলে বা কোনো কর্মকর্তা
বর্তমান রাজনৈতিক আদর্শের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ না হলে, তাকে
মূল ধারা থেকে সরিয়ে ওএসডি করে রাখা হয়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভাবের সন্দেহ থাকলে তাকে ফাইলপত্রহীন এই পদে বসিয়ে
রাখা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে
এটি অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
ইতিবাচক/প্রশাসনিক
ব্যবহার:
লিয়েন বা প্রাক-অবসর
ছুটি (PRL), উচ্চশিক্ষা, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, বা কোনো বিশেষ
প্রজেক্টের কাজ শুরুর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়। এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং রুটিন প্রক্রিয়া।
২. বাংলাদেশে
ওএসডি
কেন
বেশি
হয়?
বাংলাদেশে
ওএসডির সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
দলীয়করণ ও
রাজনৈতিক
বিবেচনা:
ক্ষমতার
পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ওএসডি করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
পদোন্নতি ও
পদের
ভারসাম্যহীনতা
(সুপারনিউমারারি
পদোন্নতি):
প্রশাসনে
প্রায়ই পদের চেয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যুগ্মসচিবের পদ যদি থাকে
৩০০টি, পদোন্নতি দেওয়া হয় ৫০০ জনকে। এই অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের
বসার জায়গা বা কাজ না
থাকায় তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে রাখা হয়।
লবিং ও
আমলাতান্ত্রিক
কোন্দল:
অনেক
সময় প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা মন্ত্রীদের সাথে
বনিবনা না হলে বা
মাঠপর্যায়ে কোনো 'ভুল' করলে (যা হয়তো শাস্তিমূলক
অপরাধ নয়) কর্মকর্তাদের "শাস্তি" হিসেবে ওএসডি করা হয়।
সংস্কারের অভাব:
বৃটিশ
আমল থেকে চলে আসা ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়া এবং
জবাবদিহিতার অভাব।
৩. আন্তর্জাতিক তুলনা: বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও পশ্চিমা দেশসমূহে OSD
|
বৈশিষ্ট্য |
বাংলাদেশ |
ভারত |
পশ্চিমা দেশসমূহ |
|
OSD-এর ব্যবহার |
বিশেষ দায়িত্বের পাশাপাশি বাস্তবে নিয়মিত পদ
থেকে
সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে |
বিশেষ দায়িত্ব, নীতি,
প্রশাসনিক কাজ
ও
ভবিষ্যৎ পদায়নের প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয় |
‘OSD’ নামে প্রচলন সীমিত; সাধারণত Special Assignment/Temporary Assignment ব্যবহৃত হয় |
|
নির্দিষ্ট কাজ |
থাকতেও পারে,
নাও
থাকতে পারে |
সাধারণত নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে |
সাধারণত নির্দিষ্ট কাজ
বা
প্রকল্প থাকে |
|
রাজনৈতিক বিতর্ক |
তুলনামূলকভাবে বেশি |
আছে,
তবে
OSD-এর
প্রশাসনিক ব্যবহারও ব্যাপক |
তুলনামূলকভাবে কম |
|
সাধারণ ধারণা |
অনেক
ক্ষেত্রে OSD হওয়াকে পদ
থেকে
সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করে
দেখা
হয় |
বিশেষ দায়িত্বের একটি
স্বীকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থা |
একই
কাজ
সাধারণত অন্য
ধরনের পদায়ন/Assignment-এর মাধ্যমে করা
হয় |
৪. চীন
ও
জাপানে
কি
এই
পদ্ধতি
আছে?
না,
চীন বা জাপানে বাংলাদেশের
মতো "কাজ ছাড়া বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া" বা "রাজনৈতিক কারণে আমলাদের ওএসডি করার" কোনো পদ্ধতি নেই। তাদের আমলাতান্ত্রিক মডেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত মেধা ও কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক
(Meritocratic)।
জাপান (The Kasumigaseki
Model)
জাপানের
আমলাতন্ত্র রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত নিরপেক্ষ। সেখানে কোনো কর্মকর্তা কাজ ছাড়া বসে আছেন—এমনটা ভাবাই যায় না।
উচ্চ কার্যদক্ষতা:
জাপানি সংস্কৃতিতে কর্মহীন বসে থাকা চরম লজ্জাজনক (যাকে তারা Mado-giwa zoku বা জানালার পাশে
বসা দল বলত, যা
মূলত বেসরকারি খাতের পুরোনো ধারণা)।
পদ্ধতি: কোনো কর্মকর্তার পারফরম্যান্স খারাপ হলে বা রাজনৈতিক মতবিরোধ
থাকলে তাকে কাজহীন করা হয় না; বরং কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো
গবেষণা বিভাগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শাখা বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায়
বদলি করা হয়। কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতেই হয়।
চীন (The Cadre System)
চীনের
ব্যবস্থাটি দল (Communist Party of
China - CPC) এবং রাষ্ট্রের একটি সংমিশ্রণ।
পারফরম্যান্স
বা
বিদায়:
চীনে কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন অত্যন্ত কঠোরভাবে হয় (Target Responsibility
System)। কোনো কর্মকর্তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে বা রাজনৈতিক লাইনের
বাইরে গেলে তাকে ওএসডি করে বসিয়ে রাখা হয় না।
পদ্ধতি: সরাসরি ডিমোশন (পদাবনতি) দেওয়া হয়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অথবা 'পার্টি স্কুলে' (Party School) দীর্ঘমেয়াদী পুনঃপ্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। দুর্নীতি বা অদক্ষতার প্রমাণ
পেলে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা কারাদণ্ড দেওয়া
হয়, কিন্তু করদাতার টাকায় বসিয়ে রাখার নিয়ম নেই।
'ওএসডি'
ধারণাটি মূলত উপমহাদেশীয় (ভারত ও বাংলাদেশ) আমলাতন্ত্রের
একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক
ব্যবস্থার উত্তরাধিকার। তবে ভারত এই পদটিকে সুনির্দিষ্ট
প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করতে পারলেও, বাংলাদেশে এটি অনেকাংশেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন এবং প্রশাসনে পদ সংকটের কারণে
কর্মকর্তাদের "কাজহীন" করে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
![]() |
| আরিফুল ইসলাম |
লেখক: আরিফুল ইসলাম
সহকারী পরিচালক
ইকরা মডেল একাডেমি

Comments
Post a Comment